অনলাইন পরীক্ষা : বাংলাদেশ কী প্রস্তুত?

  • Home
  • অনলাইন পরীক্ষা : বাংলাদেশ কী প্রস্তুত?
অনলাইন পরীক্ষা : বাংলাদেশ কী প্রস্তুত?

ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একটি স্বপ্ন, একটি প্রত্যয়। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য এক নতুন দিগন্তের আলো। ২১ শতকে একটি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দেশ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত হবে বাংলাদেশ। একটি সমৃদ্ধ ডিজিটাল সমাজ এবং একটি ডিজিটাল যুগের জনগোষ্ঠীর সম্বন্বয়ে গঠিত ডিজিটাল বাংলাদেশের স্থান হবে উন্নত দেশগুলোর পাশে। তাই পৃথিবীর সাথে তথ্যপ্রযুক্তিতে তাল মিলাতে চাই উন্নত ইন্টারনেট ব্যবস্থা। সেই সাথে তথ্যপ্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার জ্ঞান।

পুরো পৃথিবী আজ থমকে আছে। মানুষগুলো গৃহবন্দি। ঘর থেকে বের হলেই এক মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত হবার ভয়। পুরো পৃথিবী জুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাইরাসটির নাম ‘২০১৯ – এনসিওভি বা নভেল করোনাভাইরাস’। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত পৃথিবীব্যাপী মারা গেছে তিন লক্ষেরও বেশি মানুষ। প্রতিদিনই বাড়ছে সংক্রামিত রোগীর সংখ্যা। একই চিত্র বাংলাদেশেও। বাড়ছে সংক্রামিত রোগীর সংখ্যা, সাথে সাথে বেড়ে চলছে লকডাউন এবং সাধারণ ছুটি। থমকে আছে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাও। ১৮ মার্চ, ২০২০ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত শুরু হবে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম। করোনা ভাইরাসের মারাত্মক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনে। তবে আশার কথা ভাইরাসের আতঙ্কে মানুষের জীবন সাময়িকভাবে থমকে পড়লেও, ডিজিটাল বাংলাদেশের কারণে তা একেবারে থেমে পড়েনি।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার পূর্বশর্ত ছিল ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে আরো সুলভ এবং সহজে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকাংশেই সফল। শহর এবং মফস্বলের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে ইন্টারনেট। এ ইন্টারনেট সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আরো সহজ হচ্ছে মানুষের জীবন। করোনা পরিস্থিতির কারণে যখন ঘরের বাইরে বের হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ তখন মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনকে নিয়ে এসেছে অনলাইনে। অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে অফিসের কার্যক্রম, হচ্ছে ব্যাবসা-বাণিজ্য, তৈরি হচ্ছে ক্লাসরুম। হঠাৎ করেই থেমে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা আবার একটু একটু করে সচল হচ্ছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে।

অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম সত্যিকার অর্থেই এক যুগান্তকারী বিপ্লব। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের ঘরে বসেই উপস্থিত হতে পারছে ক্লাসে। অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাসের কাজগুলো করা সম্ভব ঘরে বসেই। তবে বাংলাদেশের সকল শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না অনলাইন শিক্ষার সুযোগ। অনলাইন শিক্ষার সুবিধাগুলো এখনও সীমাবদ্ধ শহর ও শহরতলীর ছাত্রদের মাঝে। কারণ বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে এখনও ব্রডব্যান্ড কানেকশন সহজলভ্য নয়। আর যেখানে ব্রডব্যান্ডের সুবিধা আছে সেখানে শহর থেকে গ্রামের দিকে ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে ব্রডব্যান্ড কানেকশনের খরচ। মোবাইল অপারেটরগুলো ইন্টারনেট সুবিধা দিলেও, এসব অপারেটরে ডেটা প্যাকেজের দাম অনেকটাই আকাশছোঁয়া। যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নাগালের বাইরে।

তবুও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুরু করেছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম। যাতে সহপাঠীদের থেকে যেন পিছিয়ে না পরতে হয় তাই শিক্ষার্থীরা যোগ দিচ্ছে অনলাইন ক্লাসে। কিন্তু সে সব অনলাইন ক্লাসও যেন এক অদ্ভুত সংগ্রাম! অনলাইন ক্লাস বাংলাদেশের ছাত্র এবং শিক্ষক উভয়ের জন্যই একটি নতুন বিষয়। শিক্ষকদের এ ব্যাপারে নেই কোনো অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণ। ছাত্ররাও ঘরে বসে ক্লাস করাতে অভ্যস্ত নয়। ফলে তাদের মধ্যে নেই যথেষ্ট মনোযোগ। বরং অনলাইন ক্লাস করার ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সৃষ্টি হচ্ছে অনীহা। আবার গ্রামাঞ্চলের ছাত্রদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে ভিন্নমুখী সমস্যার। গ্রামে যেমন ব্রডব্যান্ড সুবিধা নেই, তেমনি সমস্যা মোবাইল অপারেটরগুলোর নেটওয়ার্কে। নেটওয়ার্ক পাওয়ার জন্য ছাত্ররা ক্লাস করছে মাঠে বা রাস্তার পাশে বসে! তাতে সে মিস করে ফেলছে প্রায় সম্পূর্ণ ক্লাসটাই!

অনলাইন ক্লাসগুলোর পাশাপাশি বর্তমানে শোনা যাচ্ছে অনলাইন পরীক্ষার কথা। অনলাইন পরীক্ষা বা ই-এক্সামিনেশন হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কে সংযুক্ত ছাত্রদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভার্চুয়াল পরীক্ষা। যেখানে চিরায়ত কাগজ কলমের প্রয়োজন নেই। নোটবুক , ট্যাবলেট, কম্পিউটার ইত্যাদি ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেই এই পরীক্ষা দেয়া যায়। বেশিরভাগ অনলাইন পরীক্ষা সিস্টেমে একটি প্রসেসিং মডিউল থাকে যা খুব কম সময়ের মধ্যেই ইমেইল বা নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পরীক্ষার ফলাফল জানিয়ে দেয়। অনলাইন পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেবার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া হয়। নির্দিষ্ট সময় শেষ হয়ে গেলে পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত উইন্ডোটি বন্ধ হয়ে যায়। পৃথিবী খ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে অনলাইন পরীক্ষার সফটওয়্যারগুলো নিজেদের চাহিদা ও পছন্দ অনুযায়ী সাজিয়ে নিয়ে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ে ব্যবহার করছে। উন্নত বিশ্বে এই প্রক্রিয়াটি ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

একটি অনলাইন পরীক্ষা সঠিকভাবে পরিচালিত করার পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি ধাপ। অনলাইন পরীক্ষা নেবার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন সুপারভাইজারের। পরীক্ষা সিস্টেমটির ইউজার নিয়ন্ত্রণ, সিস্টেমের ব্যাকআপ, রিকভারির দায়িত্ব সুপারভাইজারের। এছাড়া রয়েছে কন্ডাক্টর : যারা তৈরি করবেন বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন এবং টেস্ট টেকার : যারা করবেন পরীক্ষার মূল্যায়ন। এরপর পরীক্ষা গ্রহনের নির্দিষ্ট উইন্ডোতে আপলোড করা হয় প্রশ্নটি। শিক্ষার্থীরা একটি নির্ধারিত ইউজার আইডির মাধ্যমে নির্দিষ্ট ইউন্ডোতে প্রবেশ করে পরীক্ষা দেয়। অটোমেটিকভাবেই পরীক্ষাটি মূল্যয়ন করা হয়। পরীক্ষাভেদে পরীক্ষা গ্রহণের নিরাপত্তার মাত্রাও ভিন্ন হয়। শিক্ষার্থীরা তাদের উত্তর নিশ্চিতভাবে জমা দেবার পরই পরীক্ষার মূল্যয়ন শুরু হয়। সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যেই ছাত্রদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের চেষ্টা করা হয়।

করোনা পরিস্থিতির কারণে একদম হঠাৎ করেই আমাদের শিক্ষকদের শুরু করতে হয়েছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম। তাদের কাছে সম্পূর্ন কার্যক্রমটি একেবারেই নতুন এবং জটিল।

অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহনের জন্য সে সকল ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস বা সফটওয়্যার প্রয়োজন সেগুলোও বর্তমানে তাদের কাছে সহজলভ্য নয় এবং এসবের ব্যবহারেও তারা আনাড়ি। তাই এ ব্যাপারে প্রয়োজন যথাযথ প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি পরীক্ষার মূল্যায়নের জন্য যে বিশেষ প্রক্টরিং ব্যবস্থার প্রয়োজন অনলাইন পরীক্ষা ডিজাইনের ক্ষেত্রে সেটিও বর্তমানে আমাদের দেশে করা সম্ভব না। এছাড়া অনলাইন পরীক্ষা গ্রহণের জন্য প্রয়োজন দ্রুত গতির এবং নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবস্থা। একই কথা প্রযোজ্য ছাত্রদের ক্ষেত্রেও। ইন্টারনেট ব্যবস্থা যদি ধীর গতির হয় কিংবা বারবার কানেকশন বিচ্ছিন্ন হয় তাহলে কোনো ছাত্রের পক্ষেই পরীক্ষা দেয়া সম্ভব না। পরীক্ষা দেবার জন্য প্রয়োজন একটি বিশাল ডেটা প্যাকেজের। যা চড়া দাম দিয়ে অধিকাংশ ছাত্রের পক্ষে কেনা অসম্ভব। অনলাইন পরীক্ষা দেবার মাধ্যমই হচ্ছে একটি ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস। আর সে ডিভাইসটি হতে হবে ল্যাপটপ বা ডেক্সটপের মতো কোনো ডিভাইস। কারণ স্মার্টফোনের ছোট স্ক্রীনে পরীক্ষা দেয়া সম্ভব না।এ সকল ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসগুলোও বাংলাদেশের বেশিরভাগ ছাত্রের নাগালের বাইরে। এছাড়াও রয়েছে গণিতের মতো বিষয়গুলোতে অনলাইনে পরীক্ষা দেবার নানা জটিলতা।

বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর একটি দেশ নিজের পরিচয় দিতে চায় বিশ্বের দরবারে। সে লক্ষ্যে একটু একটু করে এগিয়েও চলছে আমাদের দেশ। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ স্থাপনের পূর্বশর্ত সমাজের সকল স্তরে জ্ঞানের সহজগম্যতা। কিন্তু এখনও আমাদের দেশে জ্ঞান অর্জনের পথে অর্থনৈতিক দুরাবস্থা একটি বড় বাধা। অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের সকল ছাত্রদের জন্য এই ব্যবস্থাটি এখনও উপযুক্ত নয়। অনলাইনে পরীক্ষা দেবার জন্য ঠিক এখনই বাংলাদেশ তৈরি নয়। কিন্তু যেভাবে ধীরে ধীরে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণকারী ছাত্রের সংখ্যা বাড়ছে ; ঠিক সেভাবেই আশা করা যায় বাংলাদেশে অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণেরও উপযুক্ত পরিবেশ খুব শীঘ্রই তৈরি হবে।

# মূল লেখা পড়তে দেখুন: অনলাইন পরীক্ষা : বাংলাদেশ কী প্রস্তুত? (টকস্টোরি)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।