ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে চট্টলার মেয়ে জয়িতার জয়ধ্বনি

  • Home
  • ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে চট্টলার মেয়ে জয়িতার জয়ধ্বনি
ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে চট্টলার মেয়ে জয়িতার জয়ধ্বনি

১০০ টাকায় ১ জিবি ইন্টারনেট, আর সেখান থেকেই বাজিমাত। যাদুর পৃথিবী ইন্টারনেটকে এভাবেই কাজে লাগিয়েছেন জয়িতা ব্যানার্জি । ফ্রিল্যান্সার জয়িতা, নারী উদ্যোক্তা জয়িতা, হার না মানা জয়িতা, চাঁটগার জয়িতা। প্রথম দিকে কাজ পাওয়াটাই ছিল কষ্ট আর এখন চিন্তা থাকে এত্ত কাজ, সময়মতো বুঝিয়ে দিতে পারবো তো! নিজের নামের মতো কাজেও যিনি জয়িতা হয়ে উঠেছেন। জয় করেছেন ফ্রিল্যান্স দুনিয়া। তবে একা নন, নিজের টীম নিয়েই তাঁর এই জয়যাত্রা। নিজে নারী হয়েও অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছেন পথ প্রদর্শক। তাঁর হাত ধরেই তৈরী হচ্ছে এবং হয়েছে অনেক ফ্রিল্যান্সিং উদ্যোক্তা। নারীই শক্তি, নারীই মুক্তি – এই প্রতিপাদ্যই জয়িতার পাথেয়। পৃথিবী যদি হাতের মুঠোয় আসে ইন্টারনেট দিয়ে, সেই ইন্টারনেট দিয়েই নিজের পরিবর্তন আনা সম্ভব। সম্প্রতি জয়িতা ব্যানার্জি টক স্টোরির হেড অফ প্ল্যানার সাবিহা রহমান সুস্মিতার সাথে কথা বলেছেন বিভিন্ন বিষয়ে, তুলে ধরেছেন জীবনের গল্প, শুরুর কথা, তাঁর উদ্যোগ, তার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও নারীদের নিয়ে উদ্যোগ বিষয়ে। তারই চুম্বক অংশ তুলে ধরে হচ্ছে টক স্টোরির পাঠকদের জন্য।

শুরুতেই জানতে চাই আপনার ছেলেবেলা সম্পর্কে?
জয়িতা ব্যানার্জি :যদিও আমার ছোটবেলা বাকি পাঁচটা ছেলে মেয়ের মতো কাটে নি। আমার বাবা সরকারি চাকুরি করত এবং আমি ছোটবেলার একটা অংশ আমার মামাবাড়ি বরিশালে কাটিয়েছি। এরপরে বাবার চাকুরির কারনে চট্টগ্রামে বদলি হয় এবং আমরা বোয়ালখালিতে থাকতাম। আমার ছোটবেলা অনেকটা কঠিন গিয়েছে। আমি কারো সাথে মিশতে পারতাম না, তারপর আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়াতে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। আমার আশে পাশের মানুষরা তখন অনেক সাফল্য এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো, কিন্তু তখন সত্যি বলতে আমার বাবার সামর্থ্য ছিল নাহ আমাকে একজন আলাদা শিক্ষক দিয়ে পড়ানো। তাও আমার বাবা অনেক কষ্ট করে আমার পড়ালেখাতে আমাকে সাহায্য করেছে। ছোটবেলাতে আমার একটা ডায়েরি ছিল যেখানে আমি লিখে রাখতাম বড় হয়ে আমাকে কি করতে হবে এবং আমার কি কি চাই। ছোটবেলা নিয়ে আমার কোন আফসোস নেই এখন কারন বড় হয়ে আমি ডায়েরির সব কিছু পুরন করে ফেলেছি। 
আপনার আজকে যে সফলভাবে অনলাইন জগৎ বা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে পথচলা এটির শুরুটা কিভাবে হয়েছিল?
জয়িতা ব্যানার্জি :শুরুটা কিন্তু আমার প্রাইভেটে পড়া থেকে। আমার আশে পাশে থাকা ছাত্র- ছাত্রীরা অতো হেল্পফুল ছিল না। আমার কাছে মনে হতো আমি একা হয়ে গেয়েছি এবং আমাকে কিছু করতে হবে। তারপর আবার একগাদা সেমিস্টার ফি দিতে হতো, হাতখরচ, সব মিলিয়ে আমার মনের মধ্যে অনেক চিন্তা ছিল। আমার বন্ধুদের সহযোগিতায় আমি ফ্রিল্যান্সিং এর ব্যাপারে জানলাম। কিন্তু আমার কাছে ইন্টারনেট এর কানেকশন নেয়া অনেক কঠিন ছিল। তাই আমি প্রতিদিন টাকা জমিয়ে ১০০ টাকাতে ১ জিবি ইন্টারনেট কিনতাম এবং ভিডিও দেখতাম। একটা সময় গিয়ে আমি অনেক কাজে এপ্লাই থেকে একটা কাজ পেয়ে যাই। এরপরে আমি তিন মাস কষ্ট করে ৯ হাজার টাকা আয় করি। আর এইভাবে আমার ফ্রিল্যান্সিং শুরু হয়ে যায়। এরপরে আমি ইন্টারনেটের কানেকশন নিয়ে আরো ভালো করে শেখা শুরু করি সাথে সাথে ইংরেজিতে দক্ষ হই। এবং আস্তে আস্তে আমার কাজের পরিমান বাড়তে থাকে এবং আমার মতে আমার লাইফের ইয়োর্কারে ছক্কা পড়ে যায়। 
ছোটবেলা থেকে আপনার স্বপ্ন কি ছিল? সাফল্যের পিছনে মূল মন্ত্র কি?
জয়িতা ব্যানার্জি :সত্যি বলতে গেলে সবাই হাসবে। কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকে একজন আরজে হতে চেয়েছিলাম, এবং পেশায় একজন সাংবাদিক। কেন জানি আমার সাংবাদিকতা এর প্রতি অনেক ঝোক ছিল। কিন্তু যখন আমি বড় হতে থাকি তখন আমার স্বপ্ন ছিল না কোন। আমি ভাবতাম কিভাবে একটা দিন কাটাবো। আমাদের মতো যারা মাধ্যমিক দেয়, তাদের অনেকের স্বপ্ন থাকে যে তারা ডাক্তার হবে ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা কখনও স্বপ্ন দেখি না। আমরা আরেকজনের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন বানাই এবং আমরা আরেকজনের মতো হয়ে যাই। আমি কখনো কারো মতো হতে চাই না। আমি আমার মতো হতে চাই। আর এখন আমার মনে হয় আমার কোন স্বপ্ন নেই যা আছে তা হলো আমার দায়িত্ব। আমার সাফল্যের কোন মূলমন্ত্র নেই আসলে। কারন কারো থাকে নাহ। কিন্তু সাফল্য বলতে আসলে আমরা কি বুঝি? যদি আমরা ভালো জায়গায় থাকি জীবনে তাকে সাফল্য বলি তাহলে আমাদের গ্রথ কমে যায়। আমি যতদূর এসেছি, এখন যতোটা ভালো আছি তার পিছনের কারনটা বলা যায়। সেটা হলো অপ্রান চেষ্টা, ধৈর্য রেখে জীবনে সফল না হলেও চেষ্টা করে যাওয়া। আমার মনে হয় আমি কোন ফলাফল না চেয়েই চেষ্টা করে যাওয়া। আর আমি খুব অর্গানাইজড। আমার কোন কিছু শেখার আগে রোডম্যাপ বানিয়ে, চেকলিস্ট করে কাজ করতে ভালো লাগে।
অন্যদের তুলনায় আপনি ব্যতিক্রম কোন ক্ষেত্রে?
জয়িতা ব্যানার্জি :প্রশ্নটি শুনে আমি একটু ভাবনায় পরে গেলাম। যাই হোক আমার মনে হয় না আমি কারো তুলনায় ব্যাতিক্রম। কিন্তু আমি বলতে পারি আমি একটু পরিশ্রম বেশি করেছি হয়ত। কারন আমার কাছে জীবন একটা ১২ তালা বাড়ির মতো যেখানে আপনাকে আট তালা পর্যন্ত উঠতে হবে। আর এইটা সহজ হবে না কারো জন্য কারন আট তালা ভাবতেই কষ্ট লাগে। কিন্তু যদি আপনি একবার আট তালা উঠে যান তাহলে আর কষ্ট নেই এরপর আপনি নয় তালা , দশ তালা করে চোদ্দ তালা উঠে যেতে পারবেন। আমার মনে হয় আমরা জীবনে অনেক কিছু চাই কিন্তু তার তুলনায় যতোটা পরিশ্রম প্রয়োজন তার থেকে অনেক কম পরিশ্রম করি। আমি চাই না জীবনে কোন আফসোস থাকুক আমার তাই যতো কাজ করা দরকার করে যাচ্ছি।
একজন নারী ডিজিটাল মার্কেটার হিসেবে এ সেক্টরে চ্যালেঞ্জ কেমন?
জয়িতা ব্যানার্জি :ডিজিটাল মার্কেটিং সবার জন্য চ্যালেন্জিং। মেয়ে বলে আলাদা করার কিছু নেই। কিন্তু আমি দেখেছি মেয়েরা এই সেক্টরে কম আসে হয়ত ভয় পায় যে কি কাজ করব। আসলে যদি আমরা একটু বিস্তারিত ভেবে দেখি তাহলে মেয়েদের জন্য মার্কেটিং একটা সেক্টর যেখানে অনেক বেশি সাফল্য আসতে পারে। আর সেক্টরটিতে লোকবল কম তাই এখন সুযোগের অভাব নেই আর কেউ যদি এই সেক্টরকে নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চায় তাহলে নতুন অনেক কিছু শিখতে পারবে যা জীবনে কাজে আসবে।
পৌঁছাতে চান কোথায়?
জয়িতা ব্যানার্জি :আমি কোথাও পৌছাতে চাই না। তবে স্বপ্ন দেখি ইউরোপের কোন এক শহরে একটা ছোট্ট বাসা নিয়ে থাকব আর সেই স্বপ্ন পূরন করতে চাই এখন। বাকি সব কিছু আমি পূরন করে ফেলেছি। এবং জীবনে একজন বিনয়ী মানুষ হতে চাই।
জীবনের স্মরনীয় কোন ঘটনা, যা ভেবে আজও রোমাঞ্চিত হোন?
জয়িতা ব্যানার্জি :রোমাঞ্চিত কোন ঘটনা নেই তেমন তাও একটা খুব ভালো লাগার গল্প আছে। আমি একবার এক কম্পিটিশনে গিয়েছিলাম এবং আশা করিনি কোন কিছু। যারা খুব ভালো টিম তাদের লিডার আমার পাশে এসে বলল, যে আপনি অনেক ট্রফি পেয়েছেন জীবনে আর সবসময় জীততে হয় না। যাই হোক যদিও আমার কোন চাওয়া ছিল না ওই মূহুর্তে আমি আশা করেছি যে যে না যদি আমি জিততাম। আমি ট্রফিগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাত শুনলাম আমাদের টিম নেইম। কি শান্তি তখন, আমি তখন সেই ছেলেটিকে বললাম, চেষ্টা করলে আর চাইলে মাঝে মাঝে আল্লাহ্ সাথে থাকেন। সেই কম্পিটিশন আমি না ঘুমিয়ে করেছিলাম এবং এতো কষ্টের পর পাওনাটা খুব মনে দাগ কেটেছে।
ডিজিটাল মার্কেটিং সেক্টরের কথা যদি বলি, কয়েক’শ কোম্পানি হয়ে গেছে কিন্তু স্পেশালিষ্ট কর্মী তৈরি হচ্ছে না, এর মূল কারণ কি?
জয়িতা ব্যানার্জি :আমার মনে হয় আমরা ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কে না জেনে একটু বেশি বাড়াবাড়ি করি। কারন সেক্টরটা কিন্তু বিশাল এবং এইখানে সবকিছুতে ভালো হওয়া সম্ভব না কিন্তু। এইখানে ভালো করে কাজ করার জন্য ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া উচিত আর কোন কিছু নিয়ে শেখাটা বেশি উচিত আগে। এবং সেক্টরটা প্রাকটিকাল তাই এখানে ভুল করে করে সঠিক কি জানতে হবে। প্রচুর ইন্টারনেটে মেন্টরদের ফলো করতে হবে, পডক্যাস্ট শুনতে হবে অনেক এবং মার্কেটারদের সাথে আইডিয়া শেয়ার করতে হবে। এইগুলো ফলো করলেই যেকোন এজেন্সিতে সাফল্যের সাথে কাজ করা যাবে। সবসময় মনে রাখবেন, Marketing is a Tree that you water every day! And it will never stop growing.
উদ্যমী চেতনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, তরুণদের উদ্দেশ্যে কি বলবেন?
জয়িতা ব্যানার্জি :আমি জীবনে এতো বড় কিছু হই নি কিন্তু যারা আমার মতো জীবনে কিছু একটা করে নিজের পায়ে দাড়াতে চান তারা মনে রাখবেন জীবনে মটিভেশন দেয়ে সহজ কিন্তু জীবনে কিছু করা নিজ নিজ পরিস্থিতি থেকে সবচেয়ে কঠিন। আপনি হয়ত আপনার জায়গা থেকে অনেক কিছু করছেন। কিন্তু মনে রাখবেন জীবনে কারো ছায়াতে চলবেন না আপনার নিজের ছায়া আছে এবং সেই ছায়াকেই আপনার গতিতে এগিয়ে নিন। এবং সবার থেকে নিজের ছায়াকে আলাদা করতে কিছু নতুন করুন।

# মূল লেখা পড়তে দেখুন: চট্টলার মেয়ে জয়িতার জয়ধ্বনি (টকস্টোরি)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।