সফট স্কিল কি এবং কেন?

সফট স্কিল কি এবং কেন?

বর্তমান জগত বেশ পাল্টে গেছে। শুধু কর্মক্ষেত্র নয়,কর্মক্ষেত্রে নিয়োগ এর দিক থেকেও বেশ পরিবর্তন এসেছে। একটা সময় যে কোন প্রতিষ্ঠান বা নিয়োগদাতা শুধু হার্ড স্কিল এর ভিত্তিতে নিয়োগ দিতেন। কিন্তু বর্তমানে কোন প্রতিষ্ঠান বা নিয়োগদাতা হার্ড স্কিল ও সফট স্কিল এই দুই ধরনের দক্ষতার ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকেন। হার্ড স্কিলের সাথে আমরা সবাই বেশ ভালোই পরিচিত,তাই আজ আলোচনা করব সফট স্কিল নিয়ে।

সফট স্কিল হচ্ছে মানুষের কিছু চারিত্রিক ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য,যা তাকে অন্য মানুষের সাথে ভালোভাবে কাজ করতে, সম্পর্ক তৈরী করতে এমনকি দলগতভাবে কাজ করতে সাহায্য করে থাকে। যেমন আপনি কোনো কাজ করতে গিয়ে কত সৃজনশীল ভাবে চিন্তা করতে পারেছেন, একটি দলে থেকে কিভাবে দলবদ্ধভাবে কাজটি করছেন বা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আপনার কাজ সম্পর্কে আপনার ক্লায়েন্টকে কতটুকু সাবলীল এবং সঠিকভাবে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছেন, আপনি কিভাবে মানুষের মতামত গ্রহণ করেছেন, কোন সমস্যা হলে সেটা কিভাবে সমাধান করছেন ইত্যাদি।

হার্ড স্কিল ও সফট স্কিলের পার্থক্যের মাধ্যমে আরো সুস্পষ্ট করে সফট স্কিল ব্যাখ্যা করতে পারি, হার্ড স্কিল হচ্ছে পেশাগত দক্ষতা,যেটা পরিমাপ করা যায়।যেমন: একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এর শিক্ষার্থী কাছে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং জানাটা হচ্ছে তার হার্ড স্কিল।

কিন্তু তার সফট স্কিল হচ্ছে সে কত ভালোভাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করতে পারবে,কত সৃজনশীলতার সাথে সোশ্যাল মিডিয়াকে মার্কেটিং করবে,কত সহজে সে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে ব্রান্ডিং করতে পারবে।এটি করতে কোনো সমস্যায় পড়লে কিভাবে সে তার সমাধান করতে পারবে। কত সহজ ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে ব্রান্ডিং করাটা হচ্ছে তার সফট স্কিল। হার্ড স্কিলের ব্যবহার ইন্ডাস্ট্রি বা কাজভেদে আলাদা হয় না।  কিন্তু সফট স্কিলের ব্যবহার ইন্ডাস্ট্রি, কাজ আর পরিস্থিতির ভিত্তিতে পরিবর্তনশীল। যেমন,আপনি যদি একজন প্রকাশক হয়ে থাকেন, তাহলে একেক লেখকের সাথে একেকভাবে কথা বলবেন।

হার্ড স্কিল বই থেকে পড়ে কিংবা নির্দিষ্ট কারিকুলাম মেনে শেখা সম্ভব।। আমাদের সাধারন বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা শেষ করে একটা বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করাটা হার্ড স্কিল। কিন্তু সফট স্কিল অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কোন উপায় নেই। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে,সেগুলো সম্পন্ন করার মাধ্যমে আপনি এটি আয়ত্তে আনতে পারবেন।যেমন: আপনি শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন ক্লাব বা সংগঠন এর ভলান্টিয়ারিংয়ে যুক্ত থাকলে পেশাগত জীবনে দলের অন্যান্য কর্মীর সাথে স্বচ্ছন্দে কাজ করতে পারবেন।

হার্ড স্কিল হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট কাজ বা বিষয় এ কারো টেকনিক্যাল স্কিল আর সফট স্কিল হচ্ছে সেই কাজ বা বিষয়টি ভালোভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নন-টেকনিক্যাল স্কিল। ভালো বক্তব্য দিতে পারা,সাবলীলভাবে বুঝাতে পারা,ভালো নেতৃত্ব দেওয়া,নেটওয়ার্কিং করতে পারা।একটি মানুষের এধরনের নন-টেকনিক্যাল স্কিলগুলোকেই বলা হয় সফট স্কিল। বর্তমান জগতে তাল মিলিয়ে চলতে হলে টেকনিক্যাল স্কিলের পাশাপাশি নন-টেকনিক্যাল স্কিলগুলো অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও কমন কিছু সফট স্কিল হচ্ছে:

  • কমিনিউকেশন স্কিল বা যোগাযোগ দক্ষতা
  • দলগত ভাবে কাজ করার দক্ষতা
  • নেতৃত্ব দানের দক্ষতা
  • টাইম ম্যানেজমেন্ট বা সময় ব্যবস্থাপনা
  • সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা
  • পজিটিভ মনোভাব বা নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা
  • মানসিক চাপ সামলে কাজ করার ক্ষমতা
  • গভীর চিন্তা করার ক্ষমতা।

কমিউনিকেশন স্কিল বা যোগাযোগ দক্ষতা :

প্রতিটি ক্ষেত্রেই খুব প্রয়োজন। ব্যক্তিগত জীবনে কিংবা পেশাগত জিবনে যোগাযোগ দক্ষতা আপনার লাগবেই। সবজায়গাতেই আপনাকে বিভিন্ন ব্যক্তি,ক্লায়েন্ট,পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলতে হবে ,সুতরাং আপনি কিভাবে কথা বলছেন,আপনি যা বুঝাতে চাচ্ছেন তা বুঝাতে পারছেন কিনা এই বিষয়গুলো সব সময় খেয়াল রাখতে হবে।

দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা :

দলের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার মানসিকতা ও সক্ষমতা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দলগতভাবে কাজ করতে গিয়ে কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে তার সমাধান করতে পারা সেক্ষেত্রে আপনার দলের সবার মতামত শোনা এবং নিজের মতামত সবার কাছে ভালোভাবে উপস্থাপন করা।দলগত কাজের ক্ষেত্রে কিছু গুন আপনার থাকা দরকার, যেমন- অপরের মতামত গ্রহণ করা, অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা, সহযোগী মনোভাব, ধর্ম ,বর্ণ বিভাজন না করা ইত্যাদি।

নেতৃত্বদানের ক্ষমতা :

নেতৃত্বদানের ক্ষমতা থাকাটা অলিখিত বাধ্যতামূলক একটি সফট স্কিলই বটে। আপনাকে নেতৃত্বদানের ক্ষমতা অর্জন করতেই হবে, কেননা পেশাগত জীবনে নেতৃত্বদানের ক্ষমতা থাকাটা অপরিহার্য। মনে করেন আপনি একটি প্রজেক্টের প্রজেক্ট ম্যনেজার,অথচ আপনি আপনার নিচে যারা কাজ করছে,তাদেরকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পারছেন না,অথবা তাদেরকে আপনি ভালোভাবে বুঝাতে পারছেন না তাহলে আপনার প্রজেক্ট কোনোভাবেই ভালো ফলাফল বয়ে আনবে না।

টাইম ম্যানেজমেন্ট বা সময় ব্যবস্থাপনা :

টাইম ম্যানেজমেন্ট বা সময় ব্যবস্থাপনা একটি অলিখিত বাধ্যতামূলক সফট স্কিলই বটে।আপনাকে ব্যক্তিগত কিংবা পেশাগত জীবনে সব জায়গায়ই সময় ব্যবস্থাপনা করে চলতে হবে। অন্যথায় কখনোই সফল হতে পারবেন না।

সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা :

সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা থাকাটাও জরুরি। ধরেন আপনি মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে অভিজ্ঞ এবং আপনি সবকিছু সাধারনত মাইক্রোসফট ওয়ার্ড ২০০৭- এ করে থাকেন কিন্তু একদিন আপনার বস আপনাকে তার কম্পিউটারে একটি ফাইল তৈরী করতে বলল, কিন্তু উনার কম্পিউটারে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড ২০১৭ ইন্সটল করা কিন্তু আপনি ওয়ার্ড ২০১৭ দিয়ে কখনো ফাইল তৈরী করেন নি বা পারেন না সেক্ষেত্রে আপনাকে লজ্জিত হতে হবে তাই এসব পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আপনাকে সৃজনশীল এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

পজিটিভ মনোভাব বা নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা :

পজিটিভ মনোভাব বা নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকাটা জরুরী। ধরেন আপনার সহকর্মী কেউ করোনা আক্রান্ত হয়েছে,তাকে হেয় না করে মানসিকভাবে সাপোর্ট দেওয়টাই হচ্ছে পজিটিভ মনোভাব।আর এ গুনটি থাকলে আপনি অনেক সহজেই সফল হতে পারবেন।

মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করার ক্ষমতা :

আপনি যেখানেই বা যে কাজই করেন না কেন কাজের মধ্যে চাপ থাকবেই। এই চাপের মধ্যেই আপনাকে কাজ করতেই হবে। এই চাপের মধ্যে কোন কাজটি আগে করতে হবে আর কোন কাজটি পরে করতে হবে এসব বিষয়ে ধারনা থাকাটা প্রয়োজন।
তাই কিভাবে কাজকে সহজ করে নেওয়া যায় এবং কিভাবে চাপের মুখেও সুন্দরভাবে কাজ করা যায় সেই ক্ষমতা থাকা দরকার। তাই মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করার ক্ষমতা আপনার থাকতেই হবে।

গভীর চিন্তা করার ক্ষমতা :

গভীর চিন্তা করার ক্ষমতা আপনার থাকলেই আপনি সফল হতে পারবেন। কোনো জটিল সমস্যায় পরলে যদি সমস্যার সমাধান না করে সেটি সেভাবে ফেলে রাখেন তাহলে কি হবে ভেবেছেন? আপনি সমস্যাটি সমাধানের জন্য অনেক চিন্তা করতে হবে,প্রয়োজনে গতানুগতিক ধারার বাহিরে চিন্তা করতে হবে।এতেই সমাধানের পথ খুজে পাবেন। সফল হতে পারবেন। তাই গভীর চিন্তার গুণ থাকা অপরিহার্য।

পেশাগত জীবনে যে ক্ষেত্রেই যান না কেন এই সফট স্কিলগুলো লাগবেই!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।